• Call: +88 01711 055540
  • 23/1, Block-B, Opposite Of Shishu Mela Shyamoli Dhaka-1207

রোগের নাম টিনিটাস: স্টিমারের পাল্লা অথবা ঝিঁঝির বাসা কানে

রেহনুমা বেগমকে নিয়ে বিপাকে তাঁর ছেলে সাইফুল। এর মধ্যে দেশে–বিদেশে তিনি অনেক চিকিৎসক দেখিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু কেউই রেহনুমা বেগমের কানের ভেতর স্টিমার চলার আওয়াজ বন্ধ করতে পারছেন না। রেহনুমা বেগম অনেক চেষ্টা করেন আওয়াজটাকে পাত্তা না দেওয়ার। দিনের বেলা হয়তো কোনোভাবে কাটান। কিন্তু রাতের নির্জনে ঘুমাতে গেলেই তিনি দুই কানের এই আওয়াজের কারণে প্রায়ই নির্ঘুম রাত পার করেন। মনে হয়, যেন কোনো সাগর পাড়ি দেওয়ার পাল্লা দিচ্ছে দুই কানের দুই স্টিমার। আস্তে আস্তে রেহনুমা বেগমের ঘুম কমে যাচ্ছে, বাড়ছে রক্তচাপ। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ডায়াবেটিস।

আদিবার সামনে পরীক্ষা। রাতের ঘুম কমিয়ে পড়তে হচ্ছে। খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম তো আছেই। সঙ্গে হালকা সর্দি লেগে নাকের একপাশ বন্ধ। আস্তে আস্তে সে খেয়াল করল, বন্ধ নাকের দিকের কানটায় কেমন যেন ঝিঁঝি পোকার ডাকের মতো আওয়াজ হয়। এমনিতে পড়ার সময় বা সারা দিন তেমন কিছু মনে হয় না। কিন্তু চারপাশ চুপচাপ করে যখন পড়তে বসে কিংবা ঘুমোতে যায়, তখন এই আওয়াজ আস্তে আস্তে তাকে অতিষ্ঠ করতে থাকে।

about
about

নাক-কান-গলার বিভিন্ন রোগের সঙ্গে বা আলাদাভাবে কানে ঝিঁঝি পোকার বা স্টিমারের মতো আওয়াজের এই সমস্যা অনেকেরই হতে পারে। এই বাড়তি যে আওয়াজ, একে বলা হয় টিনিটাস (Tinnitus)। ল্যাটিন যে শব্দ থেকে ইংরেজি শব্দটির উৎপত্তি ‘টিনিয়ার’, তার অর্থ হলো ঘণ্টার শব্দ। অনেকের কানে অনেক রকম শব্দ হতে পারে। কানের কোনো রোগের কারণে যদি টিনিটাস হয়, তবে সেটা অল্প দিনের মধ্যে রোগী অনুভব করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ অনেক বছর ধরে যাদের কানে টিনিটাস আছে, তাদের শুধু কানের সংক্রমণ নয় বরং অন্য নানা রোগ থাকতে পারে। অনেক সময় রোগী যেসব আওয়াজ শুনতে পায়:-

  • স্টিমারের মতো আওয়াজ
  • শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ
  • কেটলিতে পানি বাষ্প হওয়ার আওয়াজ
  • ঘণ্টার মতো আওয়াজ
  • হিসহিস শব্দ
  • রেল ইঞ্জিন চলার আওয়াজ

অনেকে বলেন, টেলিভিশনে সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেলে যেমন আওয়াজ হয়, কানে সে রকম আওয়াজ হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসক রোগীকে পরীক্ষা করার সময় কোনো আওয়াজ শুনতে পান না। একে সাবজেকটিভ টিনিটাস বলে।

আবার কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিজেও রোগীর কানে এ ধরনের আওয়াজ শুনতে পান। কানের ভেতর কিছু টিউমার বা রক্তনালির অতি বৃদ্ধির কারণে এ রকম হতে পারে। অনেক সময় কেবল কানে সামান্য ময়লা বা খৈল জমেও টিনিটাস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে খৈল বের করে নিলেই টিনিটাস সেরে যায়।

কানের কিছু রোগ, উচ্চমাত্রার শব্দ, বাজি-পটকার আওয়াজ, হেডফোন ব্যবহারের কারণে যে টিনিটাস হয়, সেটা সাধারণত একটানা হয়ে থাকে। রক্তনালি বা অন্যান্য টিউমারের কারণে হওয়া টিনিটাসে একধরনের স্পন্দন থাকে। ধূমপান বা মদ্যপান, বড় করে হাই তোলা, জোরে শব্দ করে হাঁচি দেওয়া, জোরে নাক ঝাড়া ইত্যাদিতে টিনিটাস বাড়ে। এ ছাড়া রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, স্ট্রোকের চিকিৎসার কিছু কিছু ওষুধ, নানা রকম অ্যান্টিবায়োটিক, যক্ষ্মার ওষুধ ইত্যাদির কারণেও টিনিটাস হতে পারে।

যা যা আমাদের মনে রাখতে হবে:

মূলত আমাদের যা মনে রাখতে হবে, তা হলো টিনিটাস কোনো রোগ নয়। এটা উপসর্গ মাত্র। একজন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সময় নিয়ে কবে, কখন, কীভাবে শুরু হয়েছে থেকে শুরু করে, কী কী চিকিৎসা চলছে, দৈনন্দিন জীবনে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, সবকিছু খুলে বলতে হবে। এরপর চিকিৎসক রোগীর শরীরে আর কোনো উপসর্গ আছে কি না দেখবেন। টিনিটাসের কারণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষাও দিতে পারেন।

টিনিটাস এর চিকিৎসা:

টিনিটাস কী কারণে হচ্ছে, তা নিরূপণের পর চিকিৎসা শুরু হবে। অনেক সময় এটা কেবল বিশ্রামেই সেরে যায়। অনেক সময় কিছু আগে থেকে খেয়ে আসা ওষুধ বন্ধ করে দিলেও সেরে যায়। খাওয়াদাওয়া ও স্বভাবগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, যেমন চা-কফি, কোমল পানীয়, অ্যালকোহল, চকলেট ইত্যাদি এবং ধূমপান বন্ধ রাখা ভালো। প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন বি, জিংক, ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে এর প্রতিরোধে। এ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়ার কারণে টিনিটাস হয়ে থাকলে সেটা বন্ধ রাখা, তার পরিবর্তে অন্য ওষুধ বাজারে থেকে থাকলে সেটা খাওয়া, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শমতো টিনিটাস দূর করার ওষুধও খাওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

about
about

অনেকের কানে হিয়ারিং এইডের মতো টিনিটাস মাস্কার ব্যবহার করতে পারেন। সেটা ব্যবহার করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করলে ঘুমানোর কক্ষে টিকটিক শব্দ করে চলা দেয়ালঘড়ি অথবা মোবাইলে টিনিটাস মাস্কিং অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে।

অনেকের ক্ষেত্রে অন্ত কর্ণে বৈদ্যুতিক প্রবাহ, প্রশান্তিকারী ব্যায়াম, মেডিটেশন, কাউন্সেলিং, আকুপাংচার, সম্মোহন থেরাপি ইত্যাদি প্রয়োজন হয়। খুব অল্প ক্ষেত্রেই অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।

বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও উপযুক্ত চিকিৎসা পরিপূর্ণ আরোগ্য ও প্রশান্তিময় জীবন নিশ্চিত করে। তবে যে ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতিতেই আস্থা রাখুন না কেন, মনে রাখবেন, মনের জোরটাই হলো আসল।

কানে শোঁ শোঁ ? বহু কারণে কানে শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে।

বেশির ভাগ শোঁ শোঁ শব্দ কানের বা শরীরের অন্য কোনো রোগের উপসর্গ, যা রোগী তার কানে অনুভব করে। বাইরের কোনো শব্দ ছাড়াই নিজের কানে অস্বাভাবিক শব্দ শোনার অসুখটির নাম 'টিনিটাস'।

শব্দটি নানা রকম হতে পারে। যেমন বাঁশির, ঘণ্টার, বাতাস প্রবাহের, গুনগুন-শোঁ শোঁ শব্দ ইত্যাদি। এ ধরনের শব্দ সাধারণত এক কানে অনুভূত হয়, তবে দুই কানেও হতে পারে। টিনিটাস তিন ধরনের।

সাবজেকটিভ

বাইরের কোনো কোলাহল ছাড়া রোগী যখন কোনো অর্থহীন শব্দ শুনতে পায়। এ ক্ষেত্রে শব্দটির তীব্রতা নানা রকম হতে পারে। কেউ জোরে শোনেন, কেউ আস্তে। কেউ কেউ ২৪ ঘণ্টা একটানা শব্দ শোনেন। কেউ কেউ একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর। এটি রোগীর ঘুমে অসুবিধা করে এবং রোগী মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারে না। অবজেকটিভ

অবজেকটিভ

এক ধরনের অস্বাভাবিক শব্দ, যেটা রোগীর নিজের শরীর থেকেই উৎপত্তি হয় বলে মনে করা হয়। যেমন-বাতাস প্রবাহের মতো শব্দ, ঘূর্ণায়মান রক্তের প্রবাহ, মাথার মাংসপেশির সংকোচন, কানের ভেতর মাংসপেশির সংকোচন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকও স্টেথোস্কোপের সাহায্যে শুনতে পান।

অডিটরি হ্যালুসিনেশন

অনেক সময় রোগী নির্দিষ্ট সময় পরপর কথা বা কোলাহল শুনতে পায়। যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ থেকে এ ধরণের শব্দ উৎপন্ন হয় যা রোগী ভাবে সে শুনছে। এটি মানসিক রোগে (যেমন-সিজোফ্রেনিয়া) বেশি হয়। কানের কিছু অপারেশন, যেমন টিমপেনোপ্লাস্টি, টিমপেনোটোমিতেও টিনিটাস হতে পারে।

about
about

টিনিটাসের কারণ

টিনিটাসের বড় কারণ বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া। তবে উচ্চশব্দের মধ্যে বসবাসকারী যে কারো এটি হতে পারে। আরো কিছু সাধারণ কারণের মধ্যে আছে-

  • কানের মধ্যে খৈল বা ময়লা জমা
  • কিছু ওষুধ সেবন যেমন-অ্যাসপিরিন ও অ্যান্টিবায়োটিক
  • ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়, যেমন-কফি, পান
  • কানে ইনফেকশন বা কানের পর্দা ফেটে যাওয়া
  • দাঁত ও চোয়ালের জয়েন্টে সমস্যা
  • কানে আঘাত পাওয়া বা আকস্মিকভাবে জোরে বাতাস প্রবেশ করা
  • ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন থেরাপির প্রয়োগ
  • মারাত্মক অপুষ্টিজনিত বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়েটিংয়ের মাধ্যমে হঠাৎ বেশি ওজন হ্রাস পেলে
  • রক্তনালির কিছু সমস্যা, যেমন- ক্যারোটিড অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হলে
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • নার্ভের কিছু সমস্যা, যেমন-মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস হলে
  • মাইগ্রেন
  • কানে পানি গেলে
  • শারীরিক অন্যান্য কিছু অসুখ, যেমন-অ্যাকুয়াস্টিক নিউরোমা, রক্তশূন্যতা, ল্যাবিরিন্থিস, মিনিয়ার্স ডিজিজ, অস্টিওস্ক্লেরোসিস, থাইরয়েডজনিত অসুখ ইত্যাদি।

ঘরের চিকিৎসা

  • ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়, যেমন কফি এড়িয়ে চলুন
  • অ্যালকোহল পান করবেন না
  • ধূমপান করবেন না। কারণ নিকোটিন কানের ভেতরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালি সরু করে রক্ত প্রবাহ কমিয়ে দেয়। এতে টিনিটাসের প্রকোপ বাড়ে।
  • অ্যাসপিরিন ও ব্যথানাশক যথাসম্ভব কম সেবন করবেন
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন। ব্যায়ামে রক্তনালিতে রক্ত প্রবাহ বাড়ে। এতে টিনিটাসের প্রকোপ কমে। তবে সাইকেল চালানোর মতো ব্যায়াম এ সময় না করা ভালো।
  • উচ্চ শব্দ এড়িয়ে চলুন। কানে হেডফোন লাগাবেন না। বরং কান তুলা বা এয়ার প্লাগ দিয়ে বন্ধ রাখুন।
  • ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন থেরাপির প্রয়োগ
  • কারো কারো ক্ষেত্রে ঘরে মৃদুস্বরে গান বাজালে টিনিটাস কম হতে দেখা যায়।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

  • যদি শরীরের কোনো অংশে অবশ অবশ লাগে বা ঝিমঝিম করে
  • কানে শুনতে অসুবিধা হলে বা কানে না শুনতে পেলে
  • ভার্টিগো বা মাথাঘোরার সমস্যা হলে
  • অ্যাসপিরিন ও ব্যথানাশক যথাসম্ভব কম সেবন করবেন
  • এক সপ্তাহের বেশি সময় টিনিটাস থাকলে
  • শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধা হলে
  • বমি হলে
  • ঘন ঘন কানে শোঁ শোঁ বা টিনিটাস হলে

টিনিটাস থেকে বাঁচতে

  • উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশে কাজ বা বসবাস করা যাবে না। সেটা সম্ভব না হলে এ রকম পরিস্থিতিতে শব্দ কম শুনতে এয়ার প্লাগ ব্যবহার করতে হবে।
  • কাত হয়ে কানের নিচে হাত রেখে ঘুমানো যাবে না।
  • হেডফোনে যা-ই শুনুন, উচ্চৈঃস্বরে শুনবেন না।
  • মুটিয়ে যাওয়া মানুষের টিনিটাস বেশি হয়। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • কটন বাড বা এ ধরনের কোনো কিছু দিয়ে কান চুলকাবেন না। এতেকরে কানের পর্দা ফেটে গিয়ে কানে শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে।
  • কানে ময়লা জমলে তা বের করতে কাঠি ব্যবহার না করে অলিভ অয়েল দিন। এতে কানের ময়লাও বের হবে, পর্দাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
Blog Author

Md. Mizan Ahmed

Founder of Greenlife Hearing Center

Audiologist & Hearing Aid Specialist